নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে দলটি অনেকটা দৃশ্যপটের বাইরে থাকলেও, ভারতের মাটিতে বসেই এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাসিত নেতারা। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে আওয়ামী লীগের এই সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের খবরটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পুনর্গঠনের গোপন তৎপরতা সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের মাঝারি ও উচ্চপর্যায়ের নেতারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন দেশের ভেতর থাকা কর্মীদের সঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোপন যোগাযোগের বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আবার চাঙ্গা করার চেষ্টা চলছে। দলটির প্রধান লক্ষ্য এখন ২০২৬ সালের পরবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের একটি সুসংগঠিত অবস্থানে নিয়ে আসা। তবে দেশে যে বিপুল জনরোষ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করা দলটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরো পড়ুনঃ দিল্লি-কলকাতা থেকে ফেরার ছক: ভারতে বসে শেখ হাসিনার ‘পলিটিক্যাল কামব্যাক মিশন
দিল্লির ভূমিকা ও কূটনৈতিক সমীকরণ আওয়ামী লীগের এই ফিরে আসার চেষ্টায় ভারতের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিরাপদ আশ্রয় এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও আওয়ামী লীগের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রতাকে পুরোপুরি বিসর্জন দিতে চাইছে না। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।
আইনি বাধা ও মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে গত বছরের আন্দোলনে সংঘটিত গণহত্যার মামলাগুলো। শেখ হাসিনাসহ দলটির শীর্ষ প্রায় সব নেতার বিরুদ্ধেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া চলছে। সাধারণ মানুষের মনে দলটির প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তা নিরসন করা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। এছাড়া, দলটির অনেক সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার পথে এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ থাকায় আর্থিক সংকটেও রয়েছে তারা।
তৃণমূলের অবস্থা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা দেশের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মীরা এখনো আত্মগোপনে বা নিষ্ক্রিয়। পুলিশের মামলা ও জনরোষের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। নির্বাসিত নেতারা কর্মীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে, সময় হলে তারা আবার প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন। তবে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ মনে করে, বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং নিঃশর্ত ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত দলটির রাজনীতিতে ফেরার নৈতিক অধিকার নেই।
উপসংহার: সামনে কী ঘটবে? আওয়ামী লীগ কি পারবে তাদের হৃত গৌরব উদ্ধার করতে? ভারতের সাহায্য নিয়ে তারা কি বাংলাদেশে কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে সক্ষম হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের গতি এবং আগামী নির্বাচনের স্বচ্ছতার ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগকে ফিরতে হলে কেবল পরিকল্পনা করলেই হবে না, বরং অতীতের ভুল স্বীকার করে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। আগামী মাসগুলোতে দলটির কৌশল এবং আইনি লড়াইয়ের মোড় কোন দিকে ঘোরে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।
