Home Politics ১৭ মাসে ৯৭ মাজারে হামলা: আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে আঘাত ও নিরাপত্তার সংকট

১৭ মাসে ৯৭ মাজারে হামলা: আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে আঘাত ও নিরাপত্তার সংকট

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, এটুনিউজ২৪ (A2News24): বাংলাদেশের সুফি ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাজারগুলো এখন নজিরবিহীন নিরাপত্তা সংকটের মুখে। গত ১৭ মাসে সারা দেশে অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়।

হামলার পরিসংখ্যান ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে সারা দেশে ১৩৪টি মাজারে হামলার খবর পাওয়া গেলেও সরেজমিনে ৯৭টি ঘটনার সত্যতা মিলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় ৩৬টি এবং চট্টগ্রামে ২৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। জেলা হিসেবে শীর্ষস্থানে রয়েছে কুমিল্লা, যেখানে ১৭টি মাজারে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। এছাড়া নরসিংদীতে ১০টি ও ঢাকায় ৯টি হামলা হয়েছে। মাকামের মতে, মোট হামলার দুই-তৃতীয়াংশই ঘটেছে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে।

নেপথ্যের কারণ ও হামলার ধরন: গবেষণা অনুযায়ী, ৫৯টি হামলার মূলে ছিল ধর্মীয় মতবিরোধ। এছাড়া ২১টি ক্ষেত্রে স্থানীয় বিরোধ এবং ১৬টি ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করেছে। ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা বিশ্লেষণ করে জানানো হয়, অন্তত ২৩টি ঘটনায় নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হামলাকারীদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ঘরানার ধর্মীয় উগ্রতা লক্ষ্য করা গেছে। কেবল মাজার নয়, মাজার সংলগ্ন ৭টি মসজিদেও হামলার ঘটনা ঘটেছে এই সময়ে।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও হতাহত: প্রতিবেদনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণার তথ্যমতে, ১৩টি ঘটনায় একটি বিশেষ ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়া বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর নামও উঠে এসেছে কয়েকটি ঘটনায়। এসব তাণ্ডবে এখন পর্যন্ত ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪৬৮ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে আহত ও নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

আরো পড়ুনঃ দিল্লি-কলকাতা থেকে ফেরার ছক: ভারতে বসে শেখ হাসিনার ‘পলিটিক্যাল কামব্যাক’ মিশন

প্রশাসন ও আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, অন্তত ১০টি ঘটনায় হামলার আগে মাইকিং করে লোক জড়ো করা হলেও পুলিশ বা প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ৪৪টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং সেখানে বার্ষিক ওরসসহ সব ধরণের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ৬টি মাজার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো চরম ঘটনাও ঘটেছে।

বাংলাদেশি পাঠকদের জন্য প্রভাব: বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই পীর-আউলিয়া ও সুফি সাধকদের দেশ হিসেবে পরিচিত। মাজারগুলোতে হামলা কেবল ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত নয়, বরং হাজার বছরের লালিত উদার সংস্কৃতির ওপর বড় ধরণের আঘাত। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ও ভীতির সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সাধারণ ভক্তদের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

উপসংহার: সামনে কী অপেক্ষা করছে? মাকাম-এর পক্ষ থেকে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ১২টি রাজনৈতিক দলকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের দাবি, নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষতিগ্রস্ত মাজার সংস্কার ও নিরাপত্তার স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রশাসন যদি দ্রুত এসব ঘটনার কঠোর বিচার নিশ্চিত না করে এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ফিরিয়ে না আনে, তবে ভবিষ্যতে সামাজিক শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বড় ধরণের হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version