মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও বইছে উত্তপ্ত হাওয়া। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে ইরানের দেওয়া সাম্প্রতিক এক হুমকি নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার ঝড় তুলেছে। ইরান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োগ করা কৌশলের মতোই (মাদুরো স্টাইল) পাকড়াও করার পরিকল্পনা করছে।
কী এই ‘মাদুরো স্টাইল’ হুমকি? ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালানের অভিযোগ এনে তার মাথার ওপর বিপুল অংকের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। ইরানের পক্ষ থেকে এখন প্রায় একই ধরণের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। তেহরানের দাবি, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বা অন্য কোনো পন্থায় তাদের হাতে তুলে নিতে তারা বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়টি ইরান সরকার বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও মুদ্রার পতন এমন এক সময়ে এই হুমকির খবর সামনে এলো যখন ইরানের অভ্যন্তরে পরিস্থিতি বেশ নাজুক। দেশটিতে চলমান বিক্ষোভের মুখে ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) রেকর্ড পরিমাণ দরপতন ঘটেছে। অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, অভ্যন্তরীণ জনরোষ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই ইরান সরকার পুনরায় ট্রাম্প-বিদ্বেষী এবং জাতীয়তাবাদী আবেগ উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তুরস্কের নজরদারি ও বাফার জোনের আশঙ্কা ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক। কূটনৈতিক সূত্রের খবর, যদি ইরানে বর্তমান সরকারের পতন ঘটে বা বড় ধরণের কোনো গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তবে তুরস্ক সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘বাফার জোন’ বা বিশেষ নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। আঙ্কারার এই অবস্থান তেহরানের জন্য নতুন এক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল নৌবহর মোতায়েন ইরানের ক্রমাগত হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রও হাত গুটিয়ে বসে নেই। মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ইতিমধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর এক বিশাল নৌবহর মোতায়েন করা হয়েছে। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো ধরণের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের দাঁতভাঙা জবাব দিতে তারা প্রস্তুত। সাগরে রণতরীর এই উপস্থিতি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া জাতিসংঘসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো এই পাল্টাপাল্টি হুমকিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই ধরণের কড়া অবস্থান বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কোনো ধরণের অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়বে সারাবিশ্বের অর্থনীতিতে।
উপসংহার ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ট্রাম্পকে তুলে আনার এই হুমকি কেবল বাগাড়ম্বর নাকি এর পেছনে ইরানের কোনো গোপন পরিকল্পনা রয়েছে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি যে সুতোয় ঝুলছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
