লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন বাব আল-মানদেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। বন্দরনগর মোখা এবং জলপথের কেন্দ্রে থাকা কৌশলগত পেরিম দ্বীপ দখলের পর তারা পুরো লোহিত সাগর উপকূলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধ সপ্তম মাসে গড়ানোর প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে একমাত্র বড় বিকল্প ছিল এই নৌপথ। তবে হুতিদের এই অগ্রযাত্রায় বিকল্প পথটিও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা নতুন করে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি করেছে।
বিকল্প নৌপথ বন্ধে চরম সংকটে জ্বালানি পরিবহন
মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া ও ইউরোপে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে বাব আল-মানদেব প্রণালি দীর্ঘকাল ধরেই অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো হরমুজ প্রণালি দিয়ে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হরমুজ দিয়ে চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়লে সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল এনে তা বাব আল-মানদেব হয়ে রপ্তানি করছিল।
জ্বালানি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, একপর্যায়ে ইয়ানবু বন্দর থেকে দৈনিক প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হতো, যার প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেলই এই প্রণালি অতিক্রম করত। কিন্তু হুতিদের ধারাবাহিক হুমকি ও হামলার মুখে আগস্ট নাগাদ তা নেমে আসে মাত্র চার লাখ ব্যারেলে। বর্তমানে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হাতছাড়া হওয়ায় এবং ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটিও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় লোহিত সাগরভিত্তিক তেল সরবরাহ প্রায় ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
Read More: সৌদিতে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কার্যকারিতার পরীক্ষায় ত্রিপক্ষীয় ‘মক্কা চুক্তি’
ঘুরপথে বাণিজ্য: বাড়ছে ভাড়া ও পণ্য পরিবহনের সময়
বাব আল-মানদেব দিয়ে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যে মারাত্মক লজিস্টিক জট তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় তেল বা পণ্য পৌঁছাতে জাহাজগুলোকে এখন সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে সম্পূর্ণ আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
নৌবাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিকল্প রুটে যাতায়াত করতে অতিরিক্ত কয়েক সপ্তাহ থেকে এক মাস পর্যন্ত বাড়তি সময় লাগছে। ফলে যেমন বিপুল পরিমাণ বাড়তি জ্বালানি খরচ হচ্ছে, তেমনই অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে নাবিকদের মজুরি, নৌবিমা এবং কনটেইনারের জাহাজভাড়া। পরিবহন ব্যয়ের এই মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি সরাসরি বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কা ও ভোক্তা পর্যায়ে চাপ
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন পরিশোধনাগারে। অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন খাতকে ব্যয়বহুল করে তুলছে। বিশ্বের প্রধান প্রধান অর্থনীতিগুলোতে যখন সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা চলছিল, ঠিক তখনই জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ফলে ব্যাংক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
উপসংহার
হরমুজের পর বাব আল-মানদেব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া কেবল একটি আঞ্চলিক সামরিক সাফল্য নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের জন্য এক বড় আঘাত। আন্তর্জাতিক সামরিক শক্তিগুলোর পদক্ষেপ কিংবা আঞ্চলিক সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত এই নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির বোঝা টানতে হতে পারে।
Join our community today and stay connected with the future of PET recycling.
Subscribe to see our latest factory tours, production updates, and export success stories
