পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় লাগাতার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে মৃৎশিল্প খাত। দিন ও রাত মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ১২ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের ফলে মাটি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক বৈদুতিক চাক ঘোরানো বন্ধ রাখতে হচ্ছে কারিগরদের। চাহিদার তুলনায় নামমাত্র বিদ্যুৎ মেলায় উৎপাদন যেমন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, তেমনই বিকল্প উপায়ে জেনারেটর চালাতে গিয়ে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়। ফলে আড়ংসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় বন্ধের মুখে পড়েছে উপজেলার অর্ধশত মৃৎশিল্প কারখানা।
চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ: দৈনিক ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং
উপজেলার কাগুজিরপুল ও মদনপুরা পালপাড়া এলাকার কারখানাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। তীব্র দাবদাহ ও সার্বক্ষণিক লোডশেডিংয়ের কারণে মাটির পণ্য তৈরির কারখানাগুলোতে কাজ প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।
পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বাউফল আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় দৈনিক বিদ্যুতের স্বাভাবিক চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৮ মেগাওয়াট। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট, যা মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। তীব্র এই ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে এক ঘণ্টা পরপর পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। ফলে কারখানাগুলো এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেলেও পরের ঘণ্টায় অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। এই আসা-যাওয়ার কারণে বৈদ্যুতিক মিক্সার ও মোটরের সাহায্যে মাটির লেই বা কাই তৈরি এবং ফিনিশিংয়ের কাজ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
Read More: এক সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি: আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে লিওনেল মেসির বিদায়ের ঘোষণা
বাড়ছে উৎপাদন খরচ, হাতছাড়া হচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ
বাউফল-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে কাগুজির পুল বাসস্ট্যান্ড এলাকাটি মাটির দৃষ্টিনন্দন তৈজসপত্রের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সুপরিচিত। মহাসড়কের দুপাশে সারি সারি সাজানো থাকে দক্ষ মৃৎশিল্পীদের হাতে গড়া মাটির ফুলদানি, ছোট-বড় টব, খেলনা, শৌখিন মানচিত্র, কাপ-পিরিচ ও থালাবাসন। পথচলতি সাধারণ যাত্রী ও শৌখিন ক্রেতারা নিয়মিতই এখান থেকে মাটির সামগ্রী সংগ্রহ করেন।
স্থানীয় উদ্যোক্তা কমল পালের প্রতিষ্ঠিত ‘কমল মৃৎশিল্পী অ্যান্ড কোম্পানি’র দুটি কারখানায় নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ২০ জন কর্মী কাজ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে শোপিস ও ডিনারওয়্যারসহ প্রায় ৫৮ রকমের মাটিজাত পণ্য উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ সরবরাহ করা হয় আড়ংসহ দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন ফ্যাশন ও হস্তশিল্প ব্র্যান্ডে।
কমল পাল, বরুণ পাল, গৌতম পাল, শিশির পাল ও সমির পালসহ স্থানীয় কারখানা মালিকরা জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো পণ্য তৈরি করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে বাধ্য হয়ে ডিজেল চালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি তেলের বিপুল খরচ গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে ঘন ঘন বিরতির কারণে নির্ধারিত সময়ে ঢাকার করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সময়মতো সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই অর্ডার বাতিল করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। ফলে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান সামলাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আয় অর্ধেকে নেমে দিশেহারা কারিগর ও শ্রমিক পরিবার
উৎপাদন বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৃৎশিল্পের ওপর নির্ভরশীল শত শত শ্রমিক ও কর্মচারীর জীবনে। কারখানাগুলোতে কাজ কমে যাওয়ায় মালিকপক্ষ ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে কর্মীদের পারিশ্রমিক ও বেতন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
কমল মৃৎশিল্পীর উৎপাদন ব্যবস্থাপক বিমল চন্দ্র পালের (৫৬) পরিবারে সদস্য চারজন। ভিটেমাটির দুই শতক জমি ছাড়া কোনো সহায়-সম্বল নেই তাঁর। কারখানার চাকরিতে আগে প্রতি মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা উপার্জন করতেন তিনি, যা দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়াসহ পুরো সংসারের খরচ নির্বাহ হতো। তবে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় তাঁর মাসিক আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিমল চন্দ্র পালের মতো মদনপুরা ও বাউফল পালপাড়ার অধিকাংশ কর্মীর ঘরেই এখন চরম টানাপোড়েন চলছে। স্থানীয় কারিগরদের ভাষ্য, কাঁচামাল হিসেবে মাটির প্রক্রিয়াকরণে যেখানে দিনের বড় অংশ সময় প্রয়োজন হয়, সেখানে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তারা অলস বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে দৈনিক চুক্তিতে কাজ করা নারী-পুরুষ শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
উপসংহার
বাউফলের মৃৎশিল্প কেবল একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি শতবর্ষের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও গ্রামীণ কুটির শিল্পের প্রতীক। এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পাঞ্চল ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি না হলে এই অর্ধশত কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শত শত কারিগরের পেশা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
Join our community today and stay connected with the future of PET recycling.
👉 Visit our YouTube channel: Khoowab on YouTube
👉 Visit our Facebook Page: A2 News 24 on Facebook
Subscribe to see our latest factory tours, production updates, and export success stories.
