আসন্ন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নির্বাচনী সমঝোতার চেনা সমীকরণ ভেঙে নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের অংশীদার হিসেবে একসঙ্গে মাঠে নামলেও ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) কোনো ছাড় না দেওয়ার স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শুধু ঢাকাতেই নয়, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরেই ঐক্যের শরিক দলগুলো যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি চালাচ্ছে। তবে স্থানীয় ভোটের ময়দানে মুখোমুখি হলেও জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে এই রাজনৈতিক মোর্চা অটুট রাখার পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন শীর্ষ নেতারা।
সংসদ নির্বাচনের ঐক্য বনাম স্থানীয় সরকারের বাস্তবতা
সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারক পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বাধ্যবাধকতা না থাকা এবং তৃণমূল পর্যায়ের বাস্তবতার কারণেই শরিকদের এককভাবে মাঠে নামার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের এক যৌথ বৈঠকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে—যেসব এলাকায় সমঝোতা সম্ভব হবে সেখানে স্থানীয়ভাবে সমন্বিত প্রার্থী হতে পারে, তবে কেন্দ্র থেকে কারও ওপর কোনো একক প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ প্রসঙ্গে জানান, ১১ দলীয় ঐক্য মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে শীর্ষ নেতাদের আলোচনার ভিত্তিতেই স্থানীয় নির্বাচনে দলগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী এককভাবে লড়াই করার পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, ঢাকায় এনসিপির পাশাপাশি ঐক্যের অন্যান্য শরিক দলও নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী প্রার্থী বাছাই ও মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রস্তুত জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ মুখেরা
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের হয়ে মাঠে নামার জোর প্রস্তুতি চলছে দলটির ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতেও তরুণ ও প্রভাবশালী নেতৃত্বকে সামনে এনে মেয়র পদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে চায় দলটি। সারা দেশেই তৃণমূল পর্যায়ে এরই মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ স্থানীয় প্রার্থীর নাম প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে দলটি, যা অচিরেই একযোগে কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হতে পারে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, ঢাকার রাজনীতিতে নিজেদের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে দুই সিটিতেই শীর্ষ নেতৃত্বকে নামানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং দক্ষিণ সিটিতে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মতে, স্থানীয় সরকারে যেহেতু দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বড় নিয়ামক, তাই আলাদাভাবে অংশ নিলেও এতে জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি জোটগত সম্পর্কে কোনো চিড় ধরবে না।
Read More: এক সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি: আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে লিওনেল মেসির বিদায়ের ঘোষণা
শরিকদের নিজস্ব প্রস্তুতি: এলডিপি, খেলাফত মজলিস ও এবি পার্টি
১১ দলীয় ঐক্যের অন্যান্য দলগুলোও বসে নেই। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ঢাকার দুই সিটিতেই মেয়র প্রার্থী দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। দলটির প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সমন্বয়ক মাওলানা হাসান জুনাইদ জানিয়েছেন, দুই সিটিতে তাঁদের চারজন সম্ভাব্য প্রার্থী বিবেচনায় রয়েছেন, সেখান থেকেই চূড়ান্ত দুজনকে মনোনীত করা হবে।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু জানিয়েছেন, ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের অন্যান্য করপোরেশনেও দলের যোগ্য ব্যক্তিদের সমর্থন দেওয়া হবে। তবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী জানান, দলের সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের আলোচনার পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান প্রকাশ করা হবে।
ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাজপথে অটুট সমঝোতা
ভোটের মাঠে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ালেও জাতীয় রাজপথের আন্দোলনে দলগুলো যৌথ কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে বলে নিশ্চিত করেছে জামায়াত ও এনসিপি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিরসনসহ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে রাজপথে ১১ দলীয় ঐক্যের সম্মিলিত প্রতিবাদ ও কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম এ বিষয়ে জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচনে শরিকদের মধ্যে কোনো আসন সমঝোতা না হলেও রাজপথের বোঝাপড়ায় কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং স্থানীয় নির্বাচনে সরকারি দল বা প্রশাসন কোনো ধরনের অযাচিত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে জোটভুক্ত দলগুলো যৌথভাবেই তার তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
উপসংহার
ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন কেবল নগর পিতা নির্বাচনের লড়াই নয়, বরং জাতীয় সংসদের মিত্রদের নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিরও এক কঠিন পরীক্ষা। স্থানীয় ভোটে আলাদা প্রার্থী নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কীভাবে শরিকদের সামগ্রিক জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্য ধরে রাখতে পারে, আগামী দিনগুলোতে সেটাই হয়ে উঠবে দেখার মতো এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়।
Join our community today and stay connected with the future of PET recycling.
Subscribe to see our latest factory tours, production updates, and export success stories
