নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ দিন ৫ আগস্ট রাজধানীর আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ ভ্যানে স্তূপ করে আগুন দিয়ে পোড়ানোর সেই বীভৎস ঘটনার বিচার শেষ হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বৃহস্পতিবার এই মামলায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ মোট ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। এটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম একটি যুগান্তকারী রায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও সাজাপ্রাপ্তদের তালিকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এই সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন— আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এফ এম সায়েদ (রনি), সাবেক এসআই আব্দুল মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, স্থানীয় যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া এবং কনস্টেবল মুকুল। উল্লেখ্য, সাবেক এমপি সাইফুলসহ কয়েকজন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
একই মামলায় সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন— ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফি, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, সাবেক ইন্সপেক্টর আরাফাত হোসেন, সাবেক পরিদর্শক মাসুদুর রহমান, সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন এবং সাবেক পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস। এছাড়া সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দিন ও এএসআই কামরুল হাসানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ভস্মীভূত সেই নৃশংসতা ও সাত শহীদ ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানা সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহতদের লাশ একটি ভ্যানে করে নিয়ে গিয়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই নারকীয় ঘটনায় শহীদ হওয়া সাতজন হলেন— সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজিল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক এবং মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
রাজসাক্ষীর ক্ষমা ও বিচার প্রক্রিয়া এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হকের রাজসাক্ষী হওয়া। তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। গত বছরের ২১ আগস্ট এই মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল আজ এই চূড়ান্ত রায় দিলেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে গ্রেপ্তারকৃত ৮ জন আসামি উপস্থিত ছিলেন।
উপসংহার: সামনে কী ঘটবে? এই রায়ের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে এক নতুন মাইলফলক রচিত হলো। যারা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন শহীদদের পরিবার। এই রায়ের পর সারা দেশের ছাত্র-জনতা এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তির ছায়া নেমে এসেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায় ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে এক কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।




