বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সরকার দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা ক্রমবর্ধমান কাঠামোগত ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা।
লক্ষ্যমাত্রা বনাম বাস্তবতার ফারাক ২০২৬ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার যে স্বপ্ন বাংলাদেশ দেখছে, তার জন্য উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অপরিহার্য। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সংখ্যার বিচারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেই হবে না, তার গুণগত মান এবং টেকসই হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
Read More: সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে ব্যাপক রদবদল: নতুন দিনের লক্ষ্যে বড় সংস্কার
মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভের টানাপোড়েন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ‘মূল্যস্ফীতি’। নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্থিতিশীলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আইএমএফ-এর ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে রিজার্ভের যে সীমা বজায় রাখার কথা, তা রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা ও বিদেশি ঋণ দেশের ব্যাংকিং খাতের পাহাড়সম খেলাপি ঋণ এবং সুশাসনের অভাব অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এছাড়া মেগা প্রজেক্টগুলোর জন্য নেওয়া বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসায় রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। যদি সময়মতো রাজস্ব আদায় বাড়ানো না যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধ করা না যায়, তবে এই ঋণের বোঝা দীর্ঘমেয়াদী সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ও কর্মসংস্থান অর্থনীতির এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। কর্মসংস্থানের হার আশানুরূপভাবে না বাড়ায় শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা বাড়ছে। যখন অর্থনীতিতে বড় ধরণের প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়, তখন তার সুফল তৃণমূল পর্যায়ে কতটা পৌঁছাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আয় বৈষম্য কমানো না গেলে এই প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে না।
উপসংহার: সামনে কী অপেক্ষা করছে? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে কার্যকর নীতিনির্ধারণী সংস্কারের ওপর। কেবল উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে বরং রিজার্ভ স্থিতিশীল করা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো যদি বাস্তবসম্মত এবং দুর্নীতিমুক্ত না হয়, তবে এই উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।




