করোনা মহামারীর সময় যে ভ্যাকসিন প্রযুক্তি কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল, এখন সেই প্রযুক্তির মালিকানা নিয়েই শুরু হয়েছে এক বিশাল আইনি লড়াই। জার্মান প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেক এবং মার্কিন কোম্পানি মডার্না এখন জার্মানির ডুসেলডর্ফ আদালতে একে অপরের মুখোমুখি। এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন ‘এমআরএনএ’ (mRNA) প্রযুক্তি। কোটি কোটি ডলারের রয়্যালটি এবং ভবিষ্যতের ক্যান্সারের ওষুধের বাজার কার দখলে থাকবে, সেটিই এখন নির্ধারণ হবে এই আদালতের রায়ে।
লড়াইয়ের সূত্রপাত যেভাবে মার্কিন টেক জায়ান্ট মডার্নার দাবি, বায়োএনটেক এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফাইজার তাদের দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ পেটেন্ট করা প্রযুক্তি ব্যবহার করে করোনার ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। মডার্নার মতে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তারা এমআরএনএ প্রযুক্তির যে মৌলিক কাঠামো তৈরি করেছিল, ফাইজার-বায়োএনটেক সেটি বিনা অনুমতিতে অনুকরণ করেছে। এর জবাবে বায়োএনটেক জানিয়েছে, তাদের উদ্ভাবন সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং মডার্নার পেটেন্টগুলো আইনত বৈধ নয়।
Read More: উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি বনাম কঠিন বাস্তবতা: গভীর অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ
আদালতের লড়াই ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্প্রতি জার্মানির ডুসেলডর্ফের আঞ্চলিক আদালতে এই মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। বায়োএনটেক আদালতকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, তাদের ভ্যাকসিন তৈরির পদ্ধতি মডার্নার চেয়ে ভিন্ন। অন্যদিকে, মডার্না চায় বায়োএনটেক তাদের মুনাফার একটি অংশ রয়্যালটি হিসেবে প্রদান করুক। যদিও মডার্না স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা এই ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ করতে চায় না, কিন্তু তারা তাদের উদ্ভাবনী মেধার স্বীকৃতি ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ চায়।
ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ও বাংলাদেশের ওপর প্রভাব এই পেটেন্ট লড়াই কেবল করোনা ভ্যাকসিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এমআরএনএ প্রযুক্তি বর্তমানে ক্যান্সার, ম্যালেরিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মরণব্যাধি নিরাময়ের গবেষণাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এই মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতে এই ধরণের জীবনদায়ী ওষুধের দাম এবং সহজলভ্যতা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি পেটেন্ট জটিলতায় ওষুধের দাম বেড়ে যায়, তবে আমাদের মতো দেশগুলোর সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এর আগে বাংলাদেশও ফাইজারের ভ্যাকসিনের ওপর বড় পরিসরে নির্ভর করেছিল। ভবিষ্যতে দেশে এমআরএনএ প্রযুক্তির ভ্যাকসিন তৈরির পরিকল্পনা থাকলে, এই আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের ফলাফল নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে।
উপসংহার: সামনে কী অপেক্ষা করছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের পেটেন্ট মামলা মীমাংসা হতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। ডুসেলডর্ফ আদালতের এই রায় কেবল ইউরোপেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা গবেষণার নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শেষ পর্যন্ত কে হাসবে জয়ের হাসি—বায়োএনটেকের উদ্ভাবনী যুক্তি নাকি মডার্নার পেটেন্ট দাবি—তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বিশ্ব।




