আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে আইসিসির তৈরি করা প্রতিযোগিতার ফরম্যাট। বিশেষ করে ‘সুপার এইট’ পর্বের জন্য নির্ধারিত নিয়মগুলো নিয়ে সাবেক ক্রিকেটার, বিশ্লেষক এবং সাধারণ ভক্তদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আইসিসির এই ‘প্রি-সিডিং’ বা পূর্বনির্ধারিত বিন্যাসকে অনেকেই আধুনিক ক্রিকেটের চেতনার পরিপন্থী বলে অভিহিত করছেন।
বিতর্কের মূলে ‘প্রি-সিডিং’ ব্যবস্থা
সাধারণত যেকোনো বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী রাউন্ডের সূচি নির্ধারিত হয়। কিন্তু এবারের ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আইসিসি এক অদ্ভুত নিয়ম চালু করেছে। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই শীর্ষ দলগুলোকে নির্দিষ্ট সিডিং (যেমন- A1, A2, B1, B2) দিয়ে রাখা হয়েছে। এর ফলে একটি দল গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হোক বা রানার্সআপ, তারা আগে থেকেই জানে সুপার এইটে তাদের গ্রুপ এবং প্রতিপক্ষ কারা হতে যাচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, গ্রুপ ‘এ’ থেকে যদি কোনো বড় দল দ্বিতীয় হয়েও কোয়ালিফাই করে, তবুও তারা তাদের আগে থেকে নির্ধারিত ‘A1’ বা ‘A2’ স্থানটিই পাবে। এই নিয়মের ফলে গ্রুপ পর্বের শেষ দিকের ম্যাচগুলোর গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে, যা টুর্নামেন্টের নাটকীয়তা নষ্ট করছে।
Read More: আহমেদাবাদে ভারত এর স্বপ্নভঙ্গ: ৭৬ রানে জিতে সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার দাপুটে শুরু
ছোট দলগুলোর প্রতি বৈষম্য?
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই ফরম্যাটটি মূলত বড় দলগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। যদি কোনো সহযোগী দেশ বা ছোট দল তাদের গ্রুপে সব ম্যাচ জিতে শীর্ষস্থান দখল করে, তবুও তারা সুপার এইটে বড় দলগুলোর জন্য নির্ধারিত কঠিন গ্রুপে পড়ে যেতে পারে। এটি ছোট দেশগুলোর ভালো পারফরম্যান্সের পুরস্কার পাওয়ার পথে বড় বাধা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এটি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ টাইগাররা যদি তাদের গ্রুপে অবিশ্বাস্য খেলে শীর্ষেও থাকে, তবুও আইসিসির আগে থেকে ঠিক করে রাখা সিডিং অনুযায়ী তাদের কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
স্বচ্ছতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সংঘাত
অনেকের ধারণা, আইসিসি মূলত ব্রডকাস্টার বা সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতেই এই কাজ করেছে। প্রি-সিডিংয়ের ফলে বড় দলগুলোর হাই-ভোল্টেজ ম্যাচগুলো (যেমন- ভারত বনাম পাকিস্তান বা অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড) কোন তারিখে এবং কোন ভেন্যুতে হবে তা আগে থেকেই নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এতে টিকিট বিক্রি এবং বিজ্ঞাপনের সুবিধা হলেও খেলার মাঠের স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ভক্তদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে শেষ বল পর্যন্ত যে অনিশ্চয়তা থাকার কথা, আইসিসি তা কেড়ে নিয়েছে।
উপসংহার: সংস্কারের দাবি
বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে আইসিসি আগামী টুর্নামেন্টগুলোতে এই নিয়ম বহাল রাখবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে যেখানে ডাটা এবং পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে সবকিছু বিচার করা হয়, সেখানে এমন মান্ধাতা আমলের সিডিং ব্যবস্থা অগ্রহণযোগ্য। ক্রিকেটপ্রেমীদের দাবি, সুপার এইট বা সেমিফাইনালের পথ হওয়া উচিত সম্পূর্ণ মেধা ও গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে। আগামী দিনে আইসিসি এই সমালোচনার চাপে পড়ে নিয়মে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।




