দীর্ঘ পাঁচ দশক পর আবারও চাঁদের বুকে মানুষের পদচিহ্ন আঁকতে চায় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)। তাদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নাম ‘আর্টেমিস মিশন’ (Artemis Mission)। তবে স্বপ্নের এই মিশনটি এখন একের পর এক নতুন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। সাম্প্রতিক কারিগরি জটিলতা, যন্ত্রাংশের ত্রুটি এবং ক্রমবর্ধমান বাজেটের সংকট নাসার বিজ্ঞানীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন প্রশ্ন—নাসা কি পারবে পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পৌঁছে দিতে?
কারিগরি জটিলতা ও হার্ডওয়্যার সংকট আর্টেমিস মিশনের মূল ভিত্তি হলো শক্তিশালী এসএলএস (SLS) রকেট এবং ওরিয়ন (Orion) স্পেসক্রাফট। তবে সাম্প্রতিক পরীক্ষায় ওরিয়ন ক্যাপসুলের হিট শিল্ড বা তাপ সুরক্ষা ব্যবস্থায় কিছু অপ্রত্যাশিত ত্রুটি ধরা পড়েছে। মহাকাশ থেকে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় এই হিট শিল্ডটি নভোচারীদের জীবন রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নাসা জানিয়েছে, নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরণের ঝুঁকি তারা নিতে চায় না। এছাড়া স্পেস লঞ্চ সিস্টেমের কিছু অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশ নিয়েও নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দিচ্ছে।
Read More: মহাকাশ বিজ্ঞানে নতুন মাইলফলক: চাঁদে যাওয়ার চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখে নাসা
বাজেটের বোঝা ও সরকারি চাপ একটি বিশাল মহাকাশ অভিযানের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন। আর্টেমিস মিশনের ব্যয় ইতিমধ্যে প্রাথমিক হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে খরচের লাগাম টানার নির্দেশ থাকলেও প্রযুক্তির জটিলতা কমাতে গিয়ে ব্যয় বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না পাওয়া যায়, তবে ২০২৬ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এছাড়া স্পেস-এক্স (SpaceX) এর মতো বেসরকারি অংশীদারদের ওপর নাসার অতি-নির্ভরশীলতাও কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বাংলাদেশি তরুণদের জন্য মহাকাশ বিজ্ঞানের শিক্ষা বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী ও বিজ্ঞান অনুরাগী বর্তমানে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বা মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছেন। নাসার মতো বড় সংস্থার এই হোঁচট খাওয়া তাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। মহাকাশ গবেষণা যে কতটা সূক্ষ্ম এবং ঝুঁকিপূর্ণ, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। প্রতিকূলতা জয় করে বিজ্ঞান কীভাবে এগিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বাংলাদেশেও মহাকাশ গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, আর বৈশ্বিক এই সংকটগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বড় আলোচনার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
মহাকাশে নতুন প্রতিযোগিতার আভাস নাসা যখন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, তখন চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো তাদের চন্দ্র অভিযান নিয়ে বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে চীন ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় নাসা যদি আর্টেমিস মিশনে বড় ধরণের দেরি করে ফেলে, তবে মহাকাশ গবেষণার নেতৃত্বে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপসংহার: পরবর্তী ধাপ কী? নাসা বর্তমানে তাদের প্রতিটি যন্ত্রাংশ পুনরায় পর্যবেক্ষণ করছে এবং কারিগরি ত্রুটিগুলো সারিয়ে তুলতে দিনরাত কাজ করছে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা হতাশাজনক, তবে নাসা এখনও আশাবাদী যে তারা সব বাধা কাটিয়ে উঠতে পারবে। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকাশ গবেষণায় দেরি হওয়াটা নতুন কিছু নয়; বরং শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিযানে নামাই আসল পেশাদারিত্ব। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নাসা তাদের পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা ও সংশোধিত সময়সূচি ঘোষণা করতে পারে।




