বিদায়বেলায় তড়িঘড়ি শিক্ষা আইন: সংস্কার নাকি শুভঙ্করের ফাঁকি? তোলপাড় শিক্ষাঙ্গন

0
বিদায়বেলায় তড়িঘড়ি শিক্ষা আইন: সংস্কার নাকি শুভঙ্করের ফাঁকি? তোলপাড় শিক্ষাঙ্গন

নিজস্ব প্রতিবেদক, এটুনিউজ২৪ (A2News24): দেড় দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে অন্তর্বর্তী সরকার যখন মেয়াদের একদম শেষ প্রান্তে, ঠিক তখনই হঠাৎ আলোর মুখ দেখল বহু আলোচিত শিক্ষা আইন। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই আইনের খসড়া প্রকাশ পেতেই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্ক। শিক্ষাবিদদের মতে, মাত্র ৯ দিন পর জাতীয় নির্বাচন অথচ এমন এক সন্ধিক্ষণে জনমতের তোয়াক্কা না করে আইনের খসড়া প্রকাশ করা মূলত এক ধরণের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। তাদের আশঙ্কা, এই আইন শিক্ষার প্রকৃত সংস্কার না করে বরং বর্তমান ব্যবস্থাকেই আরও জটিল করে তুলবে।

প্রাথমিক শিক্ষায় ফিরছে পুরনো পদ্ধতি? প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়ায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি এবং পরবর্তী বিভিন্ন সরকারি ঘোষণায় প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার কথা থাকলেও, নতুন খসড়ায় এটিকে আবারও পঞ্চম শ্রেণিতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি মূলত ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনেরই একটি কপি-পেস্ট সংস্করণ, যা আধুনিক বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেখানে পুরো মাধ্যমিক স্তরকে সর্বজনীন করার জোর দাবি ছিল, সেখানে এমন পিছু হটা সিদ্ধান্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে কয়েক দশক পিছিয়ে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কোচিং ও গাইড বই: নিষিদ্ধ নাকি বৈধতা? কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশন এবং নোট-গাইড বই চিরতরে বন্ধ করার স্লোগান থাকলেও প্রস্তাবিত আইনে সেগুলোকে কৌশলে আরও তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য বৈধতা দেওয়া হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এসব বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সমালোচকরা বলছেন, দেড় দশক ধরে আলোচনার পরও কেন আরও পাঁচ বছরের সময় প্রয়োজন, তা প্রশ্নাতীত নয়। তাদের মতে, এটি মূলত বাণিজ্যিক শিক্ষা মাফিয়াদের সুযোগ দেওয়ার একটি কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়।

তড়িঘড়ি খসড়া প্রকাশ ও জনমতের অবহেলা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। এর মাত্র কিছুদিন আগে ১ ফেব্রুয়ারি খসড়াটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় এবং মতামত দেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে আবার তিন দিনই সরকারি ছুটি। শিক্ষাবিদ মনজুর আহমদের নেতৃত্বে গঠিত পরামর্শক কমিটি এখনো তাদের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেয়নি। সেই রিপোর্ট পাওয়ার আগেই কেন এই তাড়াহুড়ো, তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

কওমি মাদ্রাসা ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা আইনের খসড়ায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চেতনা পরিপন্থী কোনো কাজ পরিচালনা করা যাবে না বলেও স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে আইনটি বিধি-নির্ভর হওয়ায় অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই নির্বাহী আদেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

উপসংহার: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি একটি যুগোপযোগী শিক্ষা আইন কেবল কাগজের দলিল নয়, বরং জাতির মেরুদণ্ড গড়ার হাতিয়ার। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যেনতেনভাবে করা হলে তার মাশুল দিতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে। শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি—এই তড়িঘড়ি খসড়া বাদ দিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে সকল অংশীজনের মতামত নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা হোক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here